হিন্দু ধর্মে উপবাস মানে কি? ভগবত গীতা ও পুরাণ শাস্ত্র অনুসারে এর ব্যাখ্যা।

 উপবাস শব্দের প্রকৃত অর্থ কি ?

  • উপ + বাসউপবাস

  • উপ = নিকট, কাছে

  • বাস = থাকা বা বসবাস করা

👉 সুতরাং, উপবাস মানে হচ্ছে ঈশ্বর বা ইষ্টদেবের নিকটে থাকা, তাঁর সান্নিধ্যে নিজেকে একাগ্র করা।

📌 উদাহরণ

  • একাদশী উপবাস

  • মহাশিবরাত্রির উপবাস

  • জন্মাষ্টমীর উপবাস



🍃 উপবাসের প্রকৃত অর্থ

উপবাস মানে শুধু খাবার না খাওয়া নয়, বরং—

  1. ইন্দ্রিয়সংযম রাখা

  2. মনকে সংসারী ভোগ থেকে সরিয়ে ঈশ্বরচিন্তায় নিমগ্ন করা

  3. শরীরকে হালকা রেখে আধ্যাত্মিক সাধনায় মনোযোগী হওয়া

তাই উপবাস মানে হলো—
“ভোগবিলাস থেকে দূরে সরে, ভগবানের নিকটে মানসিকভাবে অবস্থান করা।”

🙏 শাস্ত্র মতে উপবাসের কারণ ও উদ্দেশ্য

  1. শরীর শুদ্ধি – হালকা আহার বা নিরাহার থাকার ফলে শরীরের অশুদ্ধি দূর হয়।

  2. মনসংযম – খাদ্যের আসক্তি দমন করে ভক্ত মনকে ঈশ্বরের দিকে নিয়ে যায়।

  3. ভক্তি প্রকাশ – দেব-দেবীর প্রতি শ্রদ্ধা ও আস্থা প্রকাশ করা হয়।

  4. তপস্যা – কষ্ট সহ্য করে আত্মসংযম বাড়ে, যেটি আধ্যাত্মিক উন্নতিতে সাহায্য করে।

  5. স্মরণ – উপবাসের দিনে দৈনন্দিন কাজ বাদ দিয়ে সারাদিন ধরে ভগবানের স্মরণ, নামজপ, কীর্তন, পূজা করা হয়

🥗 প্রশ্ন: যদি কেউ দৈনিক খাবার খেয়েই পূজার অঞ্জলি দেন, তাহলে কি তিনি উপবাস করলেন?

👉 উত্তর: না

  • যদি তিনি সকালবেলা খেয়ে ফেলেন, তারপর মন্দিরে গিয়ে অঞ্জলি দেন, তাহলে তিনি পূজা করেছেন ঠিকই, কিন্তু উপবাস করেননি

  • কারণ উপবাস মানে ভগবানের নিকটে মানসিকভাবে বাস করা, ইন্দ্রিয় ও খাদ্যসংযম করা

  • শুধু অঞ্জলি দেওয়াকে উপবাস বলা শাস্ত্রসম্মত নয়।

🪔 কেন সমাজে ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে?

  1. খাদ্যসংযমকেই মুখ্য ধরা হয়েছে

    • শাস্ত্র অনুযায়ী উপবাস মানে ইন্দ্রিয়-সংযম ও ভগবানের নিকটে থাকা।

    • কিন্তু মানুষ সহজভাবে বুঝতে গিয়ে ভেবেছে, “না খাওয়া মানেই উপবাস”

    • ফলে, কে খাচ্ছে না খাচ্ছে সেটাই আসল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

  2. অঞ্জলি দেওয়া আর উপবাসকে গুলিয়ে ফেলা

    • মন্দিরে বা পূজায় দেখা যায়, যারা উপবাসে থাকে তারাই অঞ্জলি দেয়।

    • ধীরে ধীরে এই ধারণা হয়েছে, “অঞ্জলি দিলেই উপবাস”

    • অথচ শাস্ত্রমতে, অঞ্জলি দেওয়া = পূজার অংশ, উপবাস = আলাদা আচার

  3. প্রথা অনুসরণে অজ্ঞতা

    • গ্রাম-গঞ্জে বা পরিবারে দেখা যায়, সবাই নির্দিষ্ট দিনে “উপবাস” বলে কিছু না খেয়ে থাকে।

    • নতুন প্রজন্ম দেখে ভেবেছে, এটাই উপবাসের আসল নিয়ম।

    • ফলে শব্দের আধ্যাত্মিক অর্থ হারিয়ে গিয়ে কেবল “না খাওয়া” বা “অঞ্জলি দেওয়া”র মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে।

  4. লোকাচার ও সহজ ব্যাখ্যা

    • শাস্ত্রীয় বিষয় সাধারণ মানুষ সহজে না বুঝে, দৈনন্দিন ব্যবহার অনুযায়ী অর্থ বানিয়ে নেয়।

    • যেমন: “অমুক আজ কিছু খাননি, মানে উপবাসে আছেন” — এটাই সমাজে প্রচলিত হয়েছে।


✅ আসল অবস্থান

  • যিনি খাবার খাননি, তিনি হয়তো অনশন করেছেন; কিন্তু উপবাস করেছেন কি না তা নির্ভর করে তিনি ভগবানের নিকটে মনোযোগী ছিলেন কি না।

  • যিনি কেবল অঞ্জলি দিলেন, তিনি পূজা করলেন; কিন্তু উপবাস না করলেও অঞ্জলি দেওয়া যায়।

👉 তাই শাস্ত্রসম্মতভাবে:

  • উপবাস = ঈশ্বরের নিকটে মানসিকভাবে থাকা + খাদ্যসংযম।

  • অঞ্জলি দেওয়া = পূজার অংশ।

📖 গীতা অনুযায়ী উপবাস

ভগবদ্গীতা (১৭ অধ্যায়, ১৪-১৬ শ্লোক)-এ “তপস্যা”র অংশ হিসেবে উপবাসকে দেখা হয়েছে।

  • এখানে বলা হয়েছে, দেহকে কষ্ট দিয়ে নয়, বরং শুদ্ধ মন, ইন্দ্রিয় সংযম আর ভক্তি নিয়ে ঈশ্বরকে স্মরণ করাই আসল তপস্যা।

  • সুতরাং, গীতায় স্পষ্ট যে উপবাস শুধু না খেয়ে থাকা নয়, বরং আত্মসংযম আর ঈশ্বরচিন্তা।


📖 মনুস্মৃতি অনুযায়ী উপবাস

মনুস্মৃতিতে উপবাসকে আচার-অনুষ্ঠানের একটি অংশ বলা হয়েছে।

  • তবে বলা হয়েছে, অতিমাত্রায় অনশন করলে শরীর দুর্বল হয়, তা ধর্মসঙ্গত নয়।

  • অর্থাৎ, শরীর নষ্ট না করে, শরীরকে হালকা করে ঈশ্বরস্মরণে মন দেওয়া—এইটাই সঠিক উপবাস।


📖 পুরাণে উপবাস

বিভিন্ন পুরাণে (বিশেষ করে বিষ্ণু পুরাণ আর পদ্ম পুরাণ) একাদশী উপবাসের গুরুত্ব বলা আছে।

  • একাদশীতে উপবাস করলে পাপক্ষয় হয়, ভক্ত ভগবানের কৃপা পান।

  • কিন্তু সেখানে বারবার জোর দেওয়া হয়েছে যে—
    👉 শরীর দিয়ে না খেয়ে থাকাই উপবাস নয়, মন দিয়েও ভগবানের নিকটে থাকতে হবে।


📖 যাজ্ঞবল্ক্য স্মৃতি

এখানে বলা আছে—

  • “উপবাসের দিনে ভক্ত যেন ক্রোধ, মিথ্যা, হিংসা ও ভোগ থেকে বিরত থাকে।”

  • তাই শুধু খাওয়া বাদ দিলে হবে না;
    👉 খারাপ কাজ থেকেও বিরত থাকা = আসল উপবাস।


🪔 সংক্ষেপে শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা

  1. উপবাস মানে শুধু খাবার ত্যাগ নয়।

  2. মন, বাক্য আর দেহ—এই তিনকে সংযত রাখা উপবাসের আসল উদ্দেশ্য।

  3. উপবাসের দিনে ভক্ত ভগবানের ধ্যান, নামজপ, পূজা-অর্চনায় মনোনিবেশ করবেন।

  4. অতিরিক্ত অনশন বা দেহ কষ্ট দেওয়া শাস্ত্রে নিরুৎসাহিত।


👉 তাই দেখা যাচ্ছে, শাস্ত্র অনুযায়ী:

  • উপবাস = সংযম + ভক্তি + ঈশ্বরস্মরণ।

  • সমাজে প্রচলিত কেবল “না খেয়ে থাকা” বা “অঞ্জলি দেওয়া” = অসম্পূর্ণ ধারণা


বিভাগসমূহ